ক্ষোভ-বিক্ষোভে টালমাটাল আইসিটি টাওয়ার

১৮ আগষ্ট, ২০২৪ ২০:৩৮  

জৈষ্ঠতা হারানোর ভয়ে চাকরি স্থায়ীকরণে বিরোধীতা?

আন্দোলন, পাল্টা আন্দোলন নিয়ে তেঁতে উঠেছে রাজধানীর প্রশাসনিক এলাকা আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ার। দীর্ঘ ১০ বছর পর গত ১৪ আগষ্ট চাকরি স্থায়করণ প্রজ্ঞাপন জারির পরও দীর্ঘ আন্দলনের ফসল ঘরে তোলা নিয়ে সংশয়ে পড়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন দুইটি প্রকল্পের ১৬৩ জন প্রোগ্রামার।

সূত্রমতে, বৈষম্যবিরোধী আন্দলনে কর্মবিরতির মাধ্যমে চাকরিতে স্থায়ী হওয়া প্রোগ্রামারদের পরে চাকরিতে যোগ দিয়েও ২০১৯ সালে স্থায়ী হওয়া সতীর্থ বেশ কয়েকজন প্রোগ্রামার বেঁকে বসেন। চাকরিতে জ্যেষ্ঠতায় পিছিয়ে গিয়ে প্রমোশন হারানো ভয়ে ১৫ আগষ্ট রাতে অবরুদ্ধ করা হয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ মোস্তফা কামালকে রাতে অবরুদ্ধ করে রাখেন ৯ম গ্রেডেট গেজেটেড কর্মকর্তারা। পরে সেনা সহায়তায় রাত আড়াইটার দিকে অবমুক্ত হন তিনি। এরপর সেই অবরুদ্ধের সময় কিছু ভুল তথ্য প্রচার করে সংক্ষুব্ধরা। এতে পরিস্থিতি ঘোলাটে হলে রবিবার বিকেলে আইসিটি টাওয়ারের সামনে বিক্ষোভ করেছে স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া ফের বিলম্বিত হওয়ায় শঙ্কিত প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামাররা।

বিক্ষভে অংশ নেয়া সহকারী প্রোগ্রামার শরীফুল ইসলামের কাছে স্থায়ীকরণ কেন জরুরী প্রশ্নের জবাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর থেকে ২০১৫ সালে জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২টি প্রকল্পের কর্মকর্তাদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়। প্রজ্ঞাপনের শর্তাবলির মধ্যে ৩নং শর্তে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত কর্মকর্তাদের ধারাবাহিকভাবে প্রকল্পকালীন কর্মকাল শুধুমাত্র পেনশন ও চাকুরীকাল গণনার জন্য বিবেচিত হবে। সেমতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের পর কর্মকর্তাদের পেফিক্সেশনে চাকরিতে যোগদানের তারিখ হিসেবে প্রকল্প যোগদানের তারিখ বিবেচনা করা হয় এবং তার প্রেক্ষিতেই হিসাবরক্ষণ অফিস হতে শ্রান্তিবিনোদনসহ অন্যান্য কাজের জন্য অর্জিত ছুটির প্রত্যয়ন প্রদান করা হয়।  ৬নং শর্তে অস্থায়ীভাবে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদসমূহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সরকারি আদেশ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। আদেশের ৫নং শর্ত অনুসারে বর্তমানে রাজস্ব খাতে অস্থায়ীভাবে সৃষ্ট পদ ৫ বছর এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদ তিন বছর পর স্থায়ী করার যে বিধান রয়েছে তা রহিত করে রাজস্ব খাতে অস্থায়ীভাবে সৃষ্ট এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদ উভয় ধরনের পদই তিন বছর পর স্থায়ী করা যাবে। এভাবে স্থায়ী করার নজির সকল দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে আছে।

তাহলে কেন এতো বছর হয়নি প্রশ্নের জাবাবে প্রোগ্রামার মোঃ তাহনিয়াতুল ইসলাম বলেন, ২০১৫ সালে স্থানান্তরিত জনবলের পরে ২০১৯ সালে অধিদপ্তরের যোগদানকারী অনুজ সহকর্মীগণ স্বল্প সময়ে তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ সম্পন্ন হয়। অপরদিকে, আমাদের নিয়মিতকরণ এবং স্থায়ীকরণ দীর্ঘ ৯ বছরে সম্পন্ন হয়নি। ২০১৯ সালে হাইকোর্টের রায়ে স্বল্পতম সময়ে প্রকল্পের জনবলের চাকরি নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আদেশ থাকলেও তা বিগত সরকারের আমলে সম্পন্ন হয়নি। আইন কানুন বোঝা ছাড়াই এই সাচিবিক কর্ম সম্পাদনের এত দীর্ঘসূত্রতার রহস্য দুদক তদন্তের মাধ্যমে ভেদ করা সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে আমাদের কলিগ আব্দুল হান্নান দুর্ঘটনা মৃত্যুবরণ করেছেন। নিয়মিতকরণ ও স্থায়ীকরণের সাচিবিক কর্মকাণ্ড সঠিক সময়ে শেষ না হওয়ায় তার বিধবা স্ত্রী ও এতিম বাচ্চা সরকারি কোনো সুবিধাই পান নাই। যা অত্যন্ত অমানবিক হয়েছে।

সূত্রমতে, ২০০৮ সাল থেকে মাঠ পর্যায়ের জনবল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটির প্রচার ও প্রসার শুরু হয় ৬৪ প্রজেক্ট এর মাধ্যমে, সেই প্রজেক্ট এর ৫০ ঊর্ধ্ব কর্মকর্তা পরবর্তীতে ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া বেসিক আইসিটি ও বাংলা গভনেট প্রজেক্ট এ উন্মুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সচিব কমিটির মতামতের ভিত্তিতে জনস্বার্থ এবং দেশের প্রয়োজনে ১ জুলাই ২০১৪ ও ১ জুলাই ২০১৫ সালে স্ব স্ব প্রকল্পের সমাপ্তির পর দিন থেকে প্রকল্পের জনবল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরে স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু তাদের প্রতি চরম বৈষম্য করে দীর্ঘ ১০/১১ বছর রাজস্ব খাতে চাকরি করার পরও তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ করা হয়নি। উল্লেখ্য স্থানান্তরিত কর্মকর্তাগণ, ৯ম গ্রেডের গেজেটেড কর্মকর্তা এবং স্থানান্তরের সময় হতে রাজস্ব বেতনভুক্ত ও নিয়মিত রাজস্ব স্কেলে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পেয়ে আসছেন।  ২০১৫-২০১৬ সালেই বিপিএটিসি-তে তাদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হলে তাদের চাকরি নিয়মিতকরণ এবং স্থায়ীকরণ করা হয় না। এমতাবস্থায় নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে স্থানান্তরিত কর্মকর্তারা তাদের চাকরি নিয়মিতকরণ ও স্থায়ীকরণের জন্য কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। কর্তৃপক্ষ তাদের আশ্বস্ত করেন যে অতিদ্রুত তাদের নিয়মিতকরণ ও স্থায়ীকরণের প্রয়োজনীয় সাচিবিক  কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু তাদের চাকরি নিয়মিতকরণ ও স্থায়ীকরণ না করে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ নিলে স্থানান্তরিত কর্মকর্তারা মামলা করেন।

২০১৯ সালে হাইকোর্ট স্থানান্তরিত কর্মকর্তাদের নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার আদেশ প্রদান করেন। ইতিমধ্যে নতুন কর্মকর্তাগণ যোগদান করেন এবং দুই বছর পর তাদের স্থায়ীকরণ করা হয় কিন্তু প্রকল্পের কর্মকর্তাগণের সাচিবিক প্রক্রিয়া ২০২৪ সালের জুলাই মাস অবধি শেষ হয় না। ফলে স্পষ্টত স্থানান্তরিত কর্মকর্তারা চরমভাবে বৈষম্যের শিকার হন। স্থানান্তরিত কর্মকর্তাদের আবেদন এবং অনুরোধের কারণে এযাবৎ কালের সকল বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (যদিও ৩ বছরের অনুবেদনই যথেষ্ট),  পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৩ সালে স্থানান্তরিত কর্মকর্তাদের চাকরি নিয়মিতকরণ করা হয়। ২০২৩ সালে নিয়মিতকরণ করা হলেও তাদের প্রতি চরম বৈষম্য করে বিভিন্ন অজুহাতে স্থায়ীকরণের ফাইল আটকে রাখা হয়। গত ১৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মহাপরিচালকস্থায়ীকরণের ফাইল স্বাক্ষর করে আইসিটি বিভাগে পাঠালে নতুন নিয়োগ পাওয়া সহকারী প্রোগ্রামাররা আমাদের স্থায়ীকরণের কার্যক্রম বাধা দিতে অধিদপ্তরের পরিচালককে নিয়ে আইসিটি বিভাগে যায় যা চরমভাবে এখতিয়ার বহির্ভূত এবং স্থানান্তরিত কর্মকর্তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা। গত ১৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আইসিটি বিভাগে সচিব স্থানান্তরিত কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন আটকে থাকা স্থায়ীকরণের ফাইল স্বাক্ষর করে। এরপর ২০১৯ সালে যোগদানকারী কিছু কর্মকর্তা সিনিয়রিটি হারানোর ভয়ে মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন দাবি নিয়ে আইসিটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অবরুদ্ধ করে অপপ্রচার শুরু করেছে।